প্রত্নবস্তু ৩: ছাপাঙ্কিত মুদ্রা
প্রত্নবস্তু নম্বর: ভিআরএম১০৩২৫
মাপ: ০.১৫ X ০.১৩ সেমি
উপাদান: রূপা
সংগ্রহের স্থান: রোহনপুর, রাজশাহী জেলা, বাংলাদেশ
সময়কাল: আনুমানিক প্রাক সা. অব্দ ষষ্ঠ থেকে দ্বিতীয় শতক
ছাপাঙ্কিত মুদ্রা তৈরি করা হতো পাতলা ধাতব পাত বা দণ্ড পিটিয়ে, যেগুলোকে পরে বর্গক্ষেত্র, আয়তক্ষেত্র বা বৃত্তাকারে কাটা হতো। এরপর এই মুদ্রাগুলোর ওজন ঠিক রাখার জন্য ও মূল্যমান অনুযায়ী ছেঁটে ছোট করে ফেলা হতো। তারপর বিভিন্ন প্রতীক সম্বলিত ছাঁচ দিয়ে এগুলোর ওপর আঘাত করে ছাপ দেওয়া হতো। এভাবেই এই মুদ্রাগুলোর নামকরণ হয়েছে ছাপাঙ্কিত মুদ্রা। ছাপের চিহ্নগুলোর মধ্যে মহাজাগতিক প্রতীক এবং প্রাণী থেকে শুরু করে নৃতাত্ত্বিক প্রতীক পর্যন্ত দেখা যায়। যেমনটি লক্ষ্য করা যায় রোহনপুরের এই মুদ্রাটির সম্মুখভাগে। তৈরির অনেক পরেও প্রচলনে থাকার কারণে, এসব মুদ্রার অনেকগুলো আবার একে অপরের উপর ছাপ তৈরি করে। যা থেকে বোঝা যায় যে, সেগুলো বিভিন্ন সময়ে ছাপ দেওয়া হয়েছিল।
ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা। সম্মুখভাগে তিনটি নৃতাত্ত্বিক অবয়ব, দাঁড়িপাল্লা ও খিলানযুক্ত পাহাড়ের উপর ময়ূরের ছাপ (ভিআরএম১০৩২৫)
ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা। সম্মুখভাগে তিনটি নৃতাত্ত্বিক অবয়ব, দাঁড়িপাল্লা ও খিলানযুক্ত পাহাড়ের উপর ময়ূরের ছাপ (ভিআরএম১০৩২৫)
ছাপাঙ্কিত মুদ্রাগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের শুরুর দিককার সময়ের ব্যাপক প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের অংশ। মহাস্থানগড়ের মতো প্রধান দুর্গনগরী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮৫ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল প্রত্নস্থলটি পরিখা ও ছয় মিটার উঁচু বেষ্টনী প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল।
মহাস্থানগড়ের মতো শহরগুলো ‘জনপদ’ নামে পরিচিত রাজ্যসমূহের অংশ ছিল। প্রতিযোগিতা ও বিজয়ের মাধ্যমে এগুলো ১৬টি ‘মহাজনপদে’ বিকশিত হয়েছিল, যার প্রত্যেকটির একটি করে রাজধানী শহর, শাসক এবং সরকারি প্রশাসন ছিল। মহাজনপদগুলোর মধ্যে এই প্রতিযোগিতাকে ‘মাৎস্যন্যায়’ বা মাছের নীতি হিসাবে বর্ণনা করা হয়। যেখানে বড় মাছ ছোট মাছকে শিকার করে, এবং পরবর্তীতে নিজেরাই আরও বড় মাছের শিকারে পরিণত হয়।
মহাস্থানগড়ের বেষ্টনী প্রাচীর ও পরিখা (ডারহাম ইউনেস্কো চেয়ার)
মহাস্থানগড়ের বেষ্টনী প্রাচীর ও পরিখা (ডারহাম ইউনেস্কো চেয়ার)
এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (শাসনকাল প্রাক সা. অব্দ ৩২৫-৩২১ থেকে শুরু করে ২৯৭ পর্যন্ত) কর্তৃক মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তাঁর নাতি অশোক (শাসনকাল প্রাক সা. অব্দ ২৭২-২৬৮ থেকে শুরু করে ২৩৫) ধর্ম, দর্শন এবং শাসন সম্পর্কিত তাঁর অনুশাসন ও শিক্ষার জন্য পরিচিত ছিলেন। এগুলো শিলাখণ্ড এবং প্রস্তর স্তম্ভে খোদাই করা হয়েছিল। মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত একটি ব্রাহ্মী শিলালিপি বর্তমান বাংলাদেশের উপর মৌর্য শাসনের সাক্ষ্য বলে ধারণা করা হয়।
দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে অশোকের অনুশাসনগুলোর বিস্তৃতি (ডারহাম ইউনেস্কো চেয়ার)
দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে অশোকের অনুশাসনগুলোর বিস্তৃতি (ডারহাম ইউনেস্কো চেয়ার)
এসব মুদ্রার বিপরীত ভাগে এবং বিশেষকরে রোহনপুরে পাওয়া মুদ্রাটির সম্মুখভাগের এক কোণে আংশিকভাবে দৃশ্যমান একটি পাহাড়ের উপরে ময়ূর প্রতীকটিকে মৌর্যদের প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ময়ূরের সংস্কৃত প্রতিশব্দ হলো ‘ময়ূরা’।
বিপরীত ভাগে খিলানযুক্ত পাহাড়ের উপর ময়ূরের ছাপ (ভিআরএম১০৩২৫)
বিপরীত ভাগে খিলানযুক্ত পাহাড়ের উপর ময়ূরের ছাপ (ভিআরএম১০৩২৫)
