বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সংগৃহীত ২৫টি প্রত্নবস্তুর আলোকে
বাংলাদেশের ইতিহাস
বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগে অবস্থিত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম বিশেষ লক্ষ্য অর্জনে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি জাদুঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯১০ সালে বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির সদস্যদের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু হয়। ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে জনসম্পদে রূপান্তরের প্রতীক হিসেবে, এর নিঃস্বার্থ পৃষ্ঠপোষকগণ এই অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পদ্ধতিগত অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও প্রদর্শন শুরু করেছিলেন, যা বর্তমানে ভাস্কর্য, মুদ্রা এবং পাণ্ডুলিপি সহ ১৭,৫০০-এরও অধিক প্রত্নবস্তুর এক অদ্বিতীয় সংগ্রহে পরিণত হয়েছে।
এই প্রত্নবস্তুগুলো কেবল নিজস্ব তাৎপর্য আর সৌন্দর্যেই অদ্বিতীয় নয়, বরং এগুলো তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্নস্থল, প্রাচীন স্থাপত্য, ঐতিহাসিক ঘটনা এবং উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের গল্পও তুলে ধরে। পাশাপাশি অতীতের সাধারণ সম্প্রদায়গুলোর দৈনন্দিন জীবনের পাশাপাশি সমসাময়িক সমাজের উপরও আলোকপাত করে।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ কর্মসূচি চলাকালীন কার্যক্রম (ডারহাম ইউনেস্কো চেয়ার)
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ কর্মসূচি চলাকালীন কার্যক্রম (ডারহাম ইউনেস্কো চেয়ার)
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের ভেতরের একটি চত্বর
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের ভেতরের একটি চত্বর
এখানে উপস্থাপিত ২৫টি প্রত্নবস্তু বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের একটি সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের দ্বারা নির্বাচিত হয়েছে। এই প্রত্নবস্তুগুলো জাদুঘরের সংগ্রহের গভীরতা ও বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি এবং জাদুঘরের প্রত্নসংগ্রহের ইতিহাসকেও প্রতিনিধিত্ব করে। একইসাথে এই প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া প্রতিটি প্রত্নবস্তুর স্বতন্ত্র আখ্যানগুলোকে একত্রিত করে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের একটি সামগ্রিক ইতিহাস চিত্রিত করা যেতে পারে এখান থেকে।
কালের বিবর্তনে যে অঞ্চলটি আজ আধুনিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, তার একটি সামগ্রিক ইতিহাস তুলে ধরার জন্য এই প্রত্নবস্তুগুলোকে বাছাই করা হলেও আমরা সম্পূর্ণভাবে সচেতন যে, আমরা সামগ্রিক আখ্যানের একটি ছোট্ট অংশকেই কেবল উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি। প্রদর্শনীতে স্থান করে নেয়া ২৫টি প্রত্নবস্তু মেধা, উদ্ভাবন এবং মানবতার বৃহত্তর গল্পের অতিক্ষুদ্র একটি খণ্ডাংশ মাত্র।
নিদর্শনগুলো ঘুরে দেখুন
এই যৌথভাবে-পরিচালিত প্রদর্শনীটি বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সমৃদ্ধ সংগ্রহের ব্যাপকতা ও গভীরতাকে উপস্থাপনের জন্য ২৫টি ব্যতিক্রমী নিদর্শন নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাস বর্ণনা করে।
১০০,০০০ বছরেরও অনেক আগে থেকে ১৯৪০-এর দশক পর্যন্ত বিস্তৃত এই সংগ্রহের বেশিরভাগ নিদর্শন বাংলাদেশে আবিষ্কৃত হলেও, অনেকগুলোই সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে তাৎপর্যপূর্ণ গল্প বহন করে।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে বঙ্গীয় অববাহিকার বাইরের বেশ কিছু নিদর্শনও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীন গান্ধার রাজ্যে প্রাপ্ত বৌদ্ধ শিল্পকর্ম। এশিয়ার সংযোগস্থল নামে পরিচিত গান্ধার, হিন্দুকুশ পর্বতমালা জুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং এটি পূর্ব ও পশ্চিমা শক্তির সংমিশ্রণের সাক্ষী ছিল। দক্ষিণ ভারতীয় শিবের ব্রোঞ্জ মূর্তিটি চোল রাজবংশের শাসনের ওপর আলোকপাত করে, যাদের ক্ষমতা একাদশ শতকে ভারত মহাসাগর পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
জাদুঘরটিতে সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শনসমূহের বাংলাদেশের একমাত্র সংগ্রহটিও রয়েছে, যা প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়ার সমসাময়িক। এটি আমাদেরকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম শহর ও সম্প্রদায়গুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, যেগুলো সিন্ধু নদ এবং পশ্চিম ভারতে প্রাক সা. অব্দ ষড়বিংশ শতক থেকে উনবিংশ শতকের মধ্যে গড়ে উঠেছিল।
নটরাজ বা দিব্য মহাজাগতিক নর্তক হিসেবে শিবের ব্রোঞ্জ মূর্তি (ভিআরএম১৬২৭), দক্ষিণ ভারতে চোল সাম্রাজ্যের (নবম থেকে ত্রয়োদশ শতক) শাসনামলে উৎপাদিত
নটরাজ বা দিব্য মহাজাগতিক নর্তক হিসেবে শিবের ব্রোঞ্জ মূর্তি (ভিআরএম১৬২৭), দক্ষিণ ভারতে চোল সাম্রাজ্যের (নবম থেকে ত্রয়োদশ শতক) শাসনামলে উৎপাদিত
সিন্ধু সভ্যতার সিলমোহর (ভিআরএম২০১৩, ভিআরএম২০১১, ভিআরএম২০২৪ এবং ভিআরএম২০১৬)
সিন্ধু সভ্যতার সিলমোহর (ভিআরএম২০১৩, ভিআরএম২০১১, ভিআরএম২০২৪ এবং ভিআরএম২০১৬)
আমরা আপনাকে আন্তরিকভাবে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানাই। আমন্ত্রণ জানাই এই প্রদর্শনীর নিদর্শনগুলো দেখার এবং আমাদের বাকি সংগ্রহগুলো ঘুরে দেখার। হয়তো আরও অনেক চমৎকার গল্প আপনার আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে!
এই প্রদর্শনীটি বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, প্রত্নতাত্ত্বিক নীতিশাস্ত্র এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুশীলন বিষয়ক ডারহাম ইউনিভার্সিটির ইউনেস্কো চেয়ার এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) যৌথভাবে কিউরেট করেছে। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের একটি সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই প্রদর্শনীটি যুক্তরাজ্য সরকারের সংস্কৃতি, মিডিয়া ও ক্রীড়া সংক্রান্ত দপ্তর ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের কালচারাল প্রোটেকশন ফান্ড এর যৌথ অর্থায়নে আয়োজন করা হয়। কালচারাল প্রোটেকশন ফান্ড ঝুঁকির সম্মুখীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষাকারী প্রকল্পসমূহকে সহায়তা প্রদান করে থাকে।
এই কর্মসূচির কার্যক্রমগুলো প্রণয়ন করেন অধ্যাপক রবিন কানিংহাম, অধ্যাপক শাহনাজ হুসনে জাহান, অধ্যাপক এমিলি উইলিয়ামস, ড. মার্ক ম্যানুয়েল, ড. ক্রিস্টোফার ডেভিস এবং ড. কাই ওয়েইজ; এবং এতে সহায়তা প্রদান করেন মি. রস উইলকিনসন, ড. কামাল বাদ্রশানি ও মিসেস ডেভিনা থম্পসন। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সকল কর্মীর সক্রিয় অংশগ্রহণ, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব, উৎসাহ এবং বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও উপ-গ্রন্থাগারিক জনাব আসলাম রেজার প্রতিশ্রুতি ও প্রজ্ঞা ব্যতীত এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং এই প্রদর্শনীর উন্নয়ন সম্ভব হতো না।
আমরা বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সভাপতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব এবং তাঁর সহকর্মীবৃন্দ; ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশ, বিশেষত মি. স্টিফেন ফোর্বস, মি. ডেভিড নক্স ও মিসেস সাদিয়া রহমান; এবং কালচারাল প্রোটেকশন ফান্ড দলের মি. ড্যানিয়েল হেড, মিসেস সুসান উইন্টার ও মি. ড্যানিয়েল হিথকে তাঁদের সম্মিলিত ও অবিচল সমর্থন এবং দিকনির্দেশনার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
পরিশেষে, আমরা বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানাই এবং ভবিষ্যতেও এই ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করছি।





