প্রত্নবস্তু : কুষাণ মুদ্রা

কুষাণ মুদ্রা (ভিআরএম৪৭৯)

কুষাণ মুদ্রা (ভিআরএম৪৭৯)

প্রত্নবস্তু নম্বর: ভিআরএম৪৭৯

মাপ: ২ X ২.২ সেমি

উপাদান: স্বর্ণ

সংগ্রহের স্থান: মহাস্থানগড়, বগুড়া জেলা, বাংলাদেশ

সময়কাল: দ্বিতীয়-তৃতীয় শতক

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর, দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে ছোট ছোট আঞ্চলিক রাজ্যের উদ্ভব ঘটে এবং শুঙ্গ রাজবংশ গঙ্গা অববাহিকা ও বাংলা অববাহিকায় একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। পশ্চিমে রোমান সাম্রাজ্য এবং হান রাজবংশের মধ্যে একটি বাণিজ্যপথ হিসেবে কুষাণ সাম্রাজ্য প্রসিদ্ধি লাভ করে। মধ্য এশিয়ায় যাযাবর অবস্থা থেকে উত্তরণের পর কুষাণরা তাদের ক্ষমতা সুসংহত করে এবং সিল্ক রোডে একটি তৃতীয় পরাশক্তিতে পরিণত হয়, যা তাদের চারপাশের সকলের উপর আধিপত্য বিস্তারে সহায়ক হয়ে ওঠে। মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত এই কুষাণ মুদ্রাটি পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে এই যোগাযোগের বাস্তব প্রমাণ।

কুষাণ সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি এবং সিল্ক রোডের স্থল-ভিত্তিক বাণিজ্য পথের মানচিত্র (ডারহাম ইউনেস্কো চেয়ার)

কুষাণ সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি এবং সিল্ক রোডের স্থল-ভিত্তিক বাণিজ্য পথের মানচিত্র (ডারহাম ইউনেস্কো চেয়ার)

মুদ্রাটি সোনা দিয়ে তৈরি, যা হিমালয় এবং মধ্য এশিয়ার পর্বতমালায় প্রাপ্ত একটি খনিজ। কুষাণ সাম্রাজ্য সম্ভবত কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতো। মুদ্রাটির গায়ে উৎকীর্ণ প্রতীকি বিষয়গুলো তুলে ধরে কিভাবে কুষাণরা বিভিন্ন জাতিগত, ধর্মীয় এবং ভাষাগত সম্প্রদায় সমন্বিত এত বিশাল একটি বিস্তীর্ণ এলাকা শাসন করতো। তারা কোনো একক মতাদর্শ চাপিয়ে দেয়নি, বরং সংযোজন এবং অভিযোজনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থানীয় চর্চা ও ধর্মকে সমর্থন করেছিল।

মুদ্রার সম্মুখ পাশ: রাজা বাসুদেবের চিত্র, গ্রিক লিপিতে ‘কিং অফ কিংস বাযোদেও কুষাণ’ নাম উল্লিখিত (ভিআরএম৪৭৯)

মুদ্রার সম্মুখ পাশ: রাজা বাসুদেবের চিত্র, গ্রিক লিপিতে ‘কিং অফ কিংস বাযোদেও কুষাণ’ নাম উল্লিখিত (ভিআরএম৪৭৯)

তাদের মুদ্রায় গ্রিক, ব্যাক্ট্রিয় এবং ব্রাহ্মী অক্ষরের পাশাপাশি ইরানি, দক্ষিণ এশীয় এবং হেলেনিস্টিক দেবদেবীর সাক্ষাৎ মেলে। এই মুদ্রার সম্মুখভাগে রাজা বাসুদেবকে (শাসনকাল ১৯১-২২৫) চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি একটি পাগড়ি বা মুকুট পরিহিত এবং একটি অগ্নিবেদীর পাশে ত্রিশূল হাতে বর্ম পরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মুদ্রার উল্টো পাশে গ্রিক ভাষায় ‘ওএসো’ নামে অভিহিত একজন দেবতাকে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি একটি কুঁজবিশিষ্ট ষাঁড়ের পাশে ত্রিশূল ধারণ করে আছেন। মনে করা হয় এটি প্রধান ব্রাহ্মণ্য দেবতাদের অন্যতম শিব এবং তাঁর বাহন নন্দীকে প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁকে জরথুষ্ট্রীয় বায়ু দেবতা ‘বায়ুশ’ হিসেবেও শনাক্ত করা হয়েছে, যা কুষাণদের আত্তীকরণের দাবীকে জোরালো করে।

মুদ্রার উল্টো পাশ: গ্রিক লিপিতে ‘ওএসো’ নাম উল্লিখিত, এবং নন্দী ষাঁড়ের পাশে শিব হিসেবে শনাক্তযোগ্য (ভিআরএম৪৭৯)

মুদ্রার উল্টো পাশ: গ্রিক লিপিতে ‘ওএসো’ নাম উল্লিখিত, এবং নন্দী ষাঁড়ের পাশে শিব হিসেবে শনাক্তযোগ্য (ভিআরএম৪৭৯)

বাংলাদেশে এই মুদ্রার আবিষ্কার দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া জুড়ে প্রধান বাণিজ্য শক্তি হিসেবে কুষাণদের ভূমিকা এবং সিল্ক রোড ধরে বাণিজ্যিক পণ্য ও কাঁচামাল প্রবাহের গুরুত্বের সাক্ষ্য দেয়। যদিও মহাস্থানগড় কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তবুও এর বাসিন্দারা তাদের প্রভাব অনুভব করতে পারতো বলে ধারণা করা হয়।